শিশুদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি না তো?

0

 
শিশুদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি না তো?
* আব্দুর রহমান আল হাসান
আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যত। এ কথা সর্ব স্বীকৃত। আজ যেই শিশুটি আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবনার পড়ে যায়, সে হয়তো ভবিষ্যতে অনেক কিছু্ জানবে এই আকাশ সম্পর্কে। তার ভাবনা তখন আর এই আকাশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না, সে ভাববে এই মহাকাশ, তারকারাজি এবং গ্যালাক্সি, ব্লাকহোল সম্পর্কে। তার ভাবনার পৃথিবীটা তখন আরো বড় হবে। সে হবে হয়তো ভবিষ্যতের কোনো বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী। সে গবেষণা করবে, আবিষ্কার করতে অজানা কিছু। যা পৃথিবীবাসীকে করে দিবে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। কিন্তু নির্মম সত্য বলে কিছু কথা আছে। সেটাই আমি আজকে বলবো। আজ থেকে দুই শতক আগ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপকহারে উন্নতি লাভ করে। সেই ধারা প্রেক্ষিতে জম্ম হয় আপেক্ষিক তথ্য। এরপর কোয়ান্টাম মেকানিক্স। এই দুটি তথ্যের উপর ভর করে একে একে তৈরী হয়, অনেক অজানা কিছু। আমাদের বর্তমানে মোবাইল, কম্পিউটার এবং নিত্নদিনকার ব্যবহৃত সকল জিনিষপত্র তৈরী হয় গত কয়েক দশক আগে। আজ থেকে দশ বছর পূর্বেও মানুষ এবং প্রযুক্তি এত আধুনিক ছিল না। আমার জন্ম তো ২০০২ সনে। সে সময় এমন স্মার্টফোন তো দূরের কথা। সাধারণ মোবাইল ফোনও তেমন একটা দেখি নি। গ্রাম থেকে শহরে কোনো খবর পাঠাতে হলে ব্যবহার করা হতো চিঠি বা ফ্যাক্স। আমি বুঝ হওয়ার পর সর্বপ্রথম মোবাইল দেখি, ২০০৫ বা ২০০৬ সনে। তখনকার মোবাইলগুলোতে শুধু কথা বলা যেতো। অবাক হয়ে যেতাম, এত দূরে অবস্থিত একজন ব্যাক্তির সাথে অন্যজন কথা বলে কিভাবে? 

ভাবতাম, হয়তো তার লাগানো থাকে। কিন্তু না। কোনো তার নয়। পরে জানলাম, এগুলো টাওয়ারের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করে। একটা অজানা জিনিষ জানার যে কি আনন্দ, তা তখন উপলদ্ধি করেছিলাম।

২০০৯ সালের কোনো একদিন। আমার আব্বু সর্বপ্রথম ক্যামেরা ওয়ালা একটা মোবাইল ফোন ক্রয় করে। আমি সেটা হাতে নিয়ে সেদিন বাস্তবেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিভাবে একটি মোবাইল আমার ছবি তুলতে পারে? তারপর অডিও, ভিডিও দেখে তো আরো অবাক হওয়ার পালা। তখন যে আমার কেমন অনুভূতি ছিল, তা বাস্তবে কখনো বুঝানো সম্ভব নয়। আর হয়তো কখনো এমন অনুভূতি পাবো না। কিন্তু আমি জানতে চাই, আজকের যারা শিশু অর্থাৎ এই সময় যারা জম্ম নিচ্ছে, তাদের তো আর এত কিছু শেখা লাগে না। তারা জম্মের পর থেকেই দেখে মোবাইল, কম্পিউটার। এমনও তো শোনা যায়, তিন বছরের বাচ্চার প্রোগ্রামার! অথচ আমি আজো এই প্রোগ্রামিং শিখতে পারি নি। ইনশাল্লাহ কোনো একদিন হয়তো শিখবো। তখন নতুন একটি জিনিষ শেখার আনন্দ পাবো। এই অনুভূতিটাও কিন্তু কম নয়।

আমি মূলত বলতে চাচ্ছি, এই যে মানুষ এত প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে, এর দ্বারা তাদের ভবিষ্যতের কি হবে? তারা তো অচিরেই মানসিক ভারসাম্য হারাবে। তখন দোষ হবে প্রযুক্তির। আসলে এই এই দোষ কার? বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির যেই উন্নতি সাধন হয়েছে, এর দ্বারা ঘরে বসেই অনেক জ্ঞান অর্জন সম্ভব। কিন্তু আমরা কি করছি? সারাদিন গেম আর রাত জেগে নিজেকে শেষ করছি। এর পাশাপাশি Facebook, Youtube তো আছেই। এই ফেইসবুক যে একজন ব্যক্তিকে কতটা বিপদে ফেলতে পারে, তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। বর্তমানে কিছু কোম্পানী আছে, যাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, ব্যবসা। তাই তারা এই খাদে ব্যবহার করছে তথ্যপ্রযুক্তিকে। মানুষের সিকিউরিটি নষ্ট হচ্ছে খুব নিমিষেই। খুব সহজেই আপনার স্মার্টফোনের কন্ট্রোল চলে যাচ্ছে তাদের হাতে। তারপর আপনাকে তারা ব্যবহার করছে পুতুলের মতো। পুতুল যেমন কখনো নিজের থেকে কিছু করতে পারে না, তেমনি আপনিও নিজে থেকে কিছু করতে পারছেন না। কিন্তু বাহ্যিক দৃষ্টিতে কিন্তু এটা মনে হবে না। তাহলে তো তাদের ব্যবসা লাটে উঠে যাবে। আমরা সবাই তো বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেইসবুক ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু কখনো কি আপনি ভেবে দেখেছেন, ফেইসবুক আপনাকে পূর্ণ সিকিউরিটি দেয় নাকি?

বর্তমানের একটা সিম্পল উদাহরণ দেই। ধরা যাক, আজ আপনি চাচ্ছেন একটা পন্য কিনতে। সেটা হতে পারে কোনো সুটকেস জাতীয় কিছু। তাই আপনি গুগলে এই সম্পর্কে খানিকটা জানার জন্য সার্চ করলেন। সেখান থেকে আপনি কয়েকটা ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেন। তাদের আর্টিকেলগুলো দেখলেন। এর মধ্যে একটা সাইটে ৭ মিনিট। অন্য একটায় ৬ মিনিট। আরেকটায় ৩ মিনিট থাকলেন। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা বুঝবো, আপনি প্রথম সাইটের পণ্যটি খানিকটা পছন্দ করেছিলেন। বাকীগুলো তেমন পছন্দ করেন নি। এবার আপনি চিরায়িত নিয়মে ফেইসবুকে ডুকে ক্রল শুরু করলেন। তখন আপনি দেখবেন, আপনি যেমন পন্য চাচ্ছিলেন, তেমন পণ্য আপনাকে দেখাচ্ছে। এরপর ধরা যাক, আপনি ঘর থেকে বের হলেন। আপনার বাসার থেকে খানিকটা দূরেই মীনা বাজার বা স্বপ্ন অথবা কোনো সুপার শপ আছে। সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেখবেন, আপনার ফোনে অটোমেটিক একটা মেসেস আসছে, অমুক পণ্যটি এখানে ২০% কমে পাওয়া যাচ্ছে।

এই যে একটা অ্যালগোরিদম বললাম, আপনি কি জানেন, এটা কিভাবে ঘটে ? আপনি যখন গুগলে কোনো কিছু সার্চ করেন তখন গুগল আপনার সেই সার্চ এবং কোন সাইটে কতক্ষণ ছিলেন, তা নিরীক্ষণ করে। তারপর ফেইসবুক সেখান থেকে আপনাকে বিভিন্ন স্পন্সরের মাধ্যমে উক্ত পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখাবে। এরপর আপনি যখন সুপার শপে গেলেন, তখন তারা আপনার সার্চ এবং ফেইসবুকের স্পন্সর দেখে এবং আপনার পছন্দ অনুয়ায়ী পণ্যের মেসেজ করবে। এটা বর্তমানে খুবই সাধারণ একটি ব্যাপার। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে আপনি এর আসল রুপ ধরতে পারবেন। সেটার দায়িত্ব না হয়, আপনার উপর ছেড়ে দিচ্ছি।

আজ যেই শিশুটি জন্ম নিচ্ছে, সে আগামীকাল ডিভাইস এবং আধুনিক যন্ত্র দেখে বড় হচ্ছে। তার বুঝ হওয়ার পূর্বেই তার হতে মোবাইল বা কম্পিউটার দেয়া হচ্ছে। সে সারাদিন এর দ্বারা গেমস খেলে বা কার্টুন দেখে সময় পার করছে। সে মাঠে গিয়ে খেলছে না। বন-বাদাঁড়ে দৌড়াদৌড়ি করছে না। বন্ধুদের সাথে মিশছে না। তার জীবন জগতে শুধু অনলাইন আর মেসেঞ্জার আছে। আরো আছে একগাদা গেমস। এর দ্বারা সে জীবন পার করছে । অদূর ভবিষ্যতে তার কি হবে?

সে কি পারবে কোনো প্রতিভার জম্ম দিতে? সে কি পারবে চিন্তা করতে শিখতে? সে কি পারবে নিজেকে মানুষের মতো গড়ে তুলতে? একজন যোগ্য মানব সন্তান হিসেবে সে কি করতে পারবে? সে নিজেকে নিঃসঙ্গ আর রবোটে পরিণত করবে। যান্ত্রিক মানব হবে সে। তার মধ্যে আবেগ, মুহাব্বাত, টান বা অন্যের জন্য দুঃখ অনুভব করাটা থাকবে না। তাহলে তার এই জীবনের মূল্য কোথায়?

আজকাল আমাদের শিশুরা পাবজি, ফ্রি ফায়ার, মোবাইল লিজেন্ট, সাবওয়ে সারফারসহ আরো বহু গেমে মত্ত। এই গেমগুলোর ডেপলপারদের তো কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এটা তাদের ব্যবসা। তারা টাকা পাচ্ছে এই গেম থেকে। আর আমার সোনার ছেলেরা তাদের টাকা নষ্ট করছে এই গেমসের মধ্যে। বাহ্ কি অসাধারণ!! না জানি কত বাবা-মায়ের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাচ্ছে। সন্তানরা আধুনিকতার ছোঁয়ায় নিজেকে নিয়ে আজ গর্ব করে। একদিন সময় আসবে, যখন তারা এর জন্য আফসোস করবে। হায়, যদি এই আধুনিকতা না থাকতো। তখন হয়তো শান্তি থাকতো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(আমি সম্মত !) #days=(20)

আসসালামু আলাইকুম, আশা করি আপনি ভালো আছেন। আমার সম্পর্কে আরো জানুনLearn More
Accept !