জিনোম সিকোয়েন্স, জীবন রহস্যের ভাষা

0


জিনোম সিকোয়েন্স, জীবন রহস্যের ভাষা

* আব্দুর রহমান আল হাসান

কখনো কি আপনি ভেবে দেখেছেন, আপনার মধ্যে আর আপনার ভাই বা আপনার বাবার থেকে আপনি কতুটুকু আলাদা? বিজ্ঞানের ভাষায়, মাত্র ০.১% পার্থক্য। এটা কি বিশ্বাস করা যায়? আচ্ছা, বিষয়টা আরো সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের জীবন বা জীবের রহস্য ‍লুকায়িত আছে ডিএনএ-এর মধ্যে, জিনোমের পরতে পরতে। আর জীবন রহস্যের সেই ভাষা উদ্গাটনের লক্ষ্যেই বিজ্ঞানীরা একের পর এক উদ্ভিদ ও প্রাণীর জিনোম সিকোয়েন্স করে চলেছেন। আর এই জিনোম বা ডিএনএ-এর ব্যাপারে বিস্তারিত বলছি। অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং  থায়ামিন। এই চারটি ক্ষারক জোড়ায় জোড়ায় থেকে তৈরী করে প্রতিটি ডিএনএ অণু। আর এই ডিএনএ অণুর সেটকে বলা হয় জিনোম। এই জিনোমই কিন্তু নির্ধারণ করে, আমাদের চোখের রং কি হবে, আমাদের চুলের রং কি হবে, আমরা খাটো হবো নাকি লম্বা হবো এমনকি ভবিষ্যতে আমাদের কোনো জেনেটিক রোগ হবে কি না। যেহেতু জিনোমে এই লুকায়িত থাকে, তাই জীববিজ্ঞানীরা আপ্রাণ চেষ্টা করেন, এই তথ্য উদ্ধার করার।

জিনোমিক তথ্য আসলে কি? এটা এখন আমরা জানি। ডিএনএতে চারটি ক্ষারকের ক্রম সব জীবের  জন্য নির্দিষ্ট। অ্যাডেনিনের পর গুয়ানিন আসবে নাকি সাইটোসিন আসবে নাকি থায়ামিন আসবে নাকি আবার অ্যাডেনিনই আসবে, এই ক্রম বা সিকোয়েন্স বের করাই ছিল গত শতাব্দীর জীববিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য। জিনোম সিকোয়েন্স বের করার ক্ষেত্রে প্রথম সফলতা এসেছিল ১৯৯৫ সালে। তখন উনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ সিকোয়েন্স করার মাধ্যমে। এরপর ব্যাকটেরিয়া শৈবাল থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত মানুষের পূ্র্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন হয় ২০০৩ সালে। বর্তমানে এক এক করে বিভিন্ন গাছ-গাছালি এবং পশু-পাখির জিনোম সিকোয়েন্স করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এবার আমরা একটু জানি, এই জিনোম সিকোয়েন্স করতে কত টাকা খরচ পড়বে আপনার? ২০০১ সালে মানুষের জিনোম সিকোয়েন্স করতে খরচ পড়তো ১০০ মিলিয়ন ডলার, ২০১৫ সালে খরচ এসে ঠেকেছে মাত্র ১ হাজার ২৪৫ ডলারে। এখন তো ২০২১ সাল চলছে। হয়তো খরচ আরো কমে গেছে আগের থেকে। এটা অবশ্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবদান। মানুষের জিনোম সিকোয়েন্স করার পর শরীরের রোগ শনাক্ত করা পূর্ব থেকে আরো অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। পূর্বেই বলেছি, একজন মানুষ থেকে অন্য একজনের পার্থক্য মাত্র ০.১%। আর এটা শনাক্ত করা হয়েছে জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে। এখন যদি আপনি আপনার শরীরের জিনোম সিকোয়েন্স করাতে যান তাহলে কষ্ট করে আপনার পূ্র্ণ শরীরের জিনোম করার প্রয়োজন নেই। আপনার মাত্র ০.১% পার্থক্যটুকু টেষ্ট বা পরীক্ষা করলেই তা যথেষ্ঠ হবে।তাহলে এতক্ষণে আপনি নিশ্চয় মানব জগতে এবং জীবজগতে জিনোম সিকোয়েন্সের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারলেন।

আজ থেকে ১৩ বছর আগে ২০০৮ সালে একটি প্রকল্প দাঁড় করানো হয়।যেখানে বিশ্বের ২৬টি জনগোষ্ঠীর প্রায় আড়াই হাজার ব্যক্তির জিনোম সিকোয়েন্সের কাজ শুরু হয়। সেই প্রকল্পের নাম ছিল, থাউজেন্ড জিনোম প্রজেক্ট।এই আড়াই হাজার ব্যক্তির মধ্যে ১৪৪ জন বাংলাদেশী উপস্থিত ছিলেন। ২০১২ সালে আবার আরেকটি প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়। তাতে ১৪টি জাতিগোষ্ঠীর ১ হাজার ২৬ জনের জিনোম সিকোয়েন্স সম্পূন্ন করা হয়। এর দ্বারা মানব শরীরের সেই ০.১% এর মধ্যে গড়ে ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া গেল।

পৃথিবীতে বর্তমানে বেশ কিছু রাষ্ট্র নিজস্ব উদ্যোগে প্রত্যেক নাগরিকের জিনোম টেষ্ট সংরক্ষণ করার কথা ভাবছে। এতে প্রত্যেকের তথ্য রাষ্ট্রের কাছে থাকবে। যদি কেউ কোনো অপরাধ করে তাহলে এই জিনোম সিকোয়েন্সের ভিত্তিতে তাকে খুব  সহজেই শনাক্ত করা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ সাধারণত নিজের মোবাইলের পাসওয়ার্ড কাউকে দিতে চায় না, তার উপর সে নিজের এত বড় তথ্য কিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কেউ যদি নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে অন্যকে ফাঁসিয়ে দিতে চায়, তাহলে  তখন তাকে ফাঁসানো অনেক সহজ কাজ হবে। এ নিয়ে  গবেষণা চলছে, চলতেই থাকবে। তবে এই  জিনোম সিকোয়েন্সে যে মানব আবিষ্কারের অন্যতম একটি অবিস্বরণীয় কর্ম, তাতে কারো কোনো দ্বিমত নেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(আমি সম্মত !) #days=(20)

আসসালামু আলাইকুম, আশা করি আপনি ভালো আছেন। আমার সম্পর্কে আরো জানুনLearn More
Accept !