আমাদেরকে কি কেউ উদ্ধার করবেন?

0


আব্দুর রহমান আল হাসান

ছবির মতন সুন্দন আমাদের স্বপ্নচূড়া গ্রামটি। প্রকৃতির অপার দান এই ভূমি। মাঠে মাঠে ধান, গম, পাট চাষ হয়। দৃষ্টির শেষ সীমায় ও ফসলি জমি শেষ হয় না। গ্রামের পূর্বকোণে আমাদের বসবাস। এদিকে এককালে নদী ছিল। কিন্তু এখন তা শুকিয়ে ৪০ কি.মি. দূরে চলে গেছে। আমার দাদা ছিলেন গ্রামের হাইস্কুলের শিক্ষক। বাবা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে গ্রামে ফসল ফলান। আমাদের প্রায় ৪০ একর জমি আছে গ্রামে।

সেদিনও প্রতিদিনকার মতো স্কুলে গেলাম আমি। হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। স্কুল ব্যাগটি মাথায় নিয়ে দৌড়িয়ে গেলাম স্কুলে। আজকে আমাদের পাশের গ্রামের সাথে ফুটবল খেলা আছে। স্কুলে আসতেই দেখি কেমন যেন খালি খালি লাগছে স্কুল প্রাঙ্গন। ভাবলাম, হয়তো বৃষ্টি বলে তারা পরে আসবে। আমি গিয়ে ক্লাসরুমে বসলাম। কিছুক্ষণ পর তানিশা আসলো। সে আমার চাচাতো বোন। তাদের বাড়ি স্কুল থেকে খানিকটা দূরে। আমরা তখন মেঝেতে বসে মার্বেল দিয়ে খেলছিলাম।

পিয়ন ক্লাসের ঘন্টা বাজিয়ে দিল। কিন্তু এখনো কেউ আসে নি। অপেক্ষা করতে লাগলাম আমি। খুব রাগ হচ্ছিল, আজকে খেলা ছিল বলে। আধ ঘন্টা পর বাংলা স্যার বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু হয়ে আসলেন। স্যার এসে দেখেন, আমরা দুইজনই আছি। তিনি বসলেন চেয়ারে। খানিকক্ষণ পর হতাশ গলায় বললেন, বুঝলি ওমর! সব শেষ। ভাবলাম, হয়তো পাশের গ্রাম খেলতে রাজি হচ্ছে না বলে আফসোস করছেন। কারণ, বাংলা স্যারই আমাদেরকে তাদের সাথে কম্পিটিশন করতে বলেছিলেন।

তারপরও জিজ্ঞাসা করলাম, স্যার কি হয়েছে? স্যার উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, আমার শশুর বাড়ির  এলাকা ডুবে গেছে। সেখানে হাটুসমান পানি।

গ্রামে যে কখনো বন্যা হয় বা পানি উঠে, এটা আমার জানা ছিল না। আমি হেসে বললাম, স্যার মজা করছেন? কিভাবে গ্রামে পানি উঠতে পারে? এত বৃষ্টিও তো হয় নি সেখানে। বর্ষাকালেও তো কখনো গ্রামে পানি উঠে না। তিনি কখন হতাশ গলায় বললেন, নারে উমর ! উঠে। ও তুই বুঝবি না।

তানিশা স্যারকে বললো, স্যার বাবা বলেছিল দেশে নাকি বন্যা হবে?

স্যার চমকে উঠে বললেন, তুই কিভাবে জানলি? তানিশা বললো, আমার বাবা বলেছে।

স্যার তখন আক্ষেপ করে বললেন, ইন্ডিয়া বাঁধ খুলে দিয়ে আমাদের এলাকাগুলো তলিয়ে দিচ্ছে। এই গ্রামেও সপ্তাখানেকের মধ্যে পানি চলে আসবে।

আমি তখন চমকে গিয়ে স্যারকে বললাম, স্যার আমরা কি খেলতে পারবো না?

স্যার দুঃখিত হয়ে বললেন, বেঁচে থাকলে খেলার সময় আসবে। এখন আগে নিজের জীবন বাঁচা।

স্যার আমাদের প্রয়োজনীয় কিছু  কথা বলে বললেন, হেডস্যার আজকে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে। তোরা বাড়ি চলে যা। পড়াশোনা কর। বন্যা আসলে উঁচু স্থানে থাকবি। পানিতে নামবি না। বন্যার পানি এমনিতেই জীবানুযুক্ত।

আমরা স্কুল থেকে বের হয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। স্কুলগেট থেকে বের হওয়ার সময় তানিশা বললো, ওমর স্কুল খুলবে কবে রে?

আমি বললাম, জানি নারে। তানিশা বললো, চল স্যারকে জিজ্ঞাসা করি। তানিশা এমনিতেই ভালো ছাত্রী। পড়ালেখা তার কাছে নেশার মতো। আমি আর কথা না বাড়িয়ে স্যারের কাছে গেলাম। সেখানে হেডস্যারও ছিল। জিজ্ঞাসা করলাম স্যারকে। হেডস্যার ছলছল নয়নে বললেন, যেদিন বন্যা যাবে সেদিন খুলবো স্কুল। তোমরা পারলে বাড়িতে পড়াশোনা কইরো। এরপর চলে আসলাম আমরা।

 

২.

(দুই সপ্তাহ পর)

: অ্যাই ওমর! বিছানা থেকে নিচে নামিস না।

: আচ্ছা বাবা।

বন্যায় এতটা পানি উঠেছে, আমাকে এখন ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। ঘটনাটা সত্যি। আমাদের এলাকা ডুবে গেল। আমাদের ঘরে গতকাল হাঁটু সমান পানি ছিল। এখন তা বেড়ে আরো বেশি। ঘরে থাকা খাট খুলে আব্বু ছাদের উপর নিয়ে এসেছে। আমাদের ঘর দালান হওয়ায় উপরে ছাদ আছে। সেখানে আমরা বসে আছ। পানির তীব্রতা এতটা বেশি, ছাদে পানি উঠতে আর চার ইঞ্চি বাকী আছে। আমাদের ঘরে খাবার রান্না হচ্ছে না। গ্যাস নাই। চুলা তো পানির নিচে। শুকনো খাবার তো আগে থেকে মজুদ ছিল না। তাই এখন আক্ষেপ করা ছাড়া কিছুই করার নেই। আমাদের এলাকা শহরতলী থেকে ভেতরে থাকায় এখানে কোনো ত্রান পৌছে নি। কারেন্ট থাকে না একটুও। বাবা কয়েকবার সরকারি সাহায্য চেয়েও কোনো ফল পায় নি।

আমাদের গ্রামের প্রতিটা ঘরেরই করুণ দশা। ৬টা বাচ্চা মারা গেছে এই বন্যায়। কিন্তু কে তাদের জন্য শোক প্রকাশ করবে? ঠিকমতো তাদের দাফনও করা যায় নি। কোথায় দাফন করবে? চারিদিকে পানি আর পানি। আমাদের খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে দিন কয়েক আগেই। কিন্তু বিপদে পড়ে এখন বন্যার ময়লা পানিই খাওয়া লাগে। আমার গল্পের বইগুলো ভিজে জবজবা হয়ে গেছে। বাসার ফার্নিচার, ফ্রিজ, বাবার কম্পিউটারসহ আরো অনেক কিছুই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ঘরে কয়েকলাখ টাকা ছিল। এগুলো ভিজে ছিঁড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমাদের ধানক্ষেত, পাটক্ষেত, আখক্ষেত, আম বাগান, লিচু বাগানসহ আরো অনেকগুলো বাগানের অস্ত্বিত্ব বিলিন হয়ে গেছে। ঘরের সামনে রোপন করা আমার ফুল গাছগুলো আর নেই।

ধমকা হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সেগুলো। গতবার স্যার পরীক্ষায় পাশ করার পর উপহার হিসেবে একটা সুন্দর খেলনা দিয়েছিল। সেটাও এই বন্যার ঢল ছেড়ে দেয় নি। আমরা একরকম আবদ্ধ অবস্থায় দিন কাঁটাচ্ছি। আমাদের সহায়-সম্বল সব শেষ। বাবার ব্যবসার ৬০ লাখ টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বাজারে থাকা আমাদের দোকান, আমাদের গোডাউন ডুবে গেছে। মালামালগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের জন্য এখনকার পরিস্থিতি কেয়ামতের দিনের মতো। কেউ কি আসবেন আমাদের সাহায্য করতে? কেউ কি আসবেন আমাদের উদ্ধার করতে?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(আমি সম্মত !) #days=(20)

আসসালামু আলাইকুম, আশা করি আপনি ভালো আছেন। আমার সম্পর্কে আরো জানুনLearn More
Accept !